পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল: উদ্ভাবক জামালপুরের তরুণ তৌহিদুল….

জামালপুরের কৃতি সন্তান তৌহিদুল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭’তে তার নিজের ওই উদ্ভাবন নিয়ে এসে সব শ্রেনী পেশার মানুষ বিশেষ করে উদ্যোক্তাদের নজর কেড়েছেন।। পুরোনো পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন করেছেন তিনি। শুধুমাত্র তেলই না, মিথেন গ্যাস ও ছাপাকাজে ব্যবহারের জন্য কালিও বানিয়েছেন তিনি পলিথিন থেকেই।ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকেও একইভাবে জ্বালানি তেল তৈরি করেছেন তৌহিদুল।২০১১ সালে তিনি সফলভাবে প্রথম তেল উৎপাদন করেছিলেন।জামালপুর জেলা সদর থেকে দক্ষিনে কোজগড়ের মঙ্গলপুর গ্রাম।এই গ্রামেই তৌহিদুলের বাড়ি।বাবা আব্দুল মান্নান ও মা হালিমা খাতুন।ছোটবেলা থেকেই মেধাবী তৌহিদুলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন বাবা-মা।বড় হয়ে নিজ অধ্যবসায় এবং মেধা দিয়ে নব উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছেন তিনি।ফেলে দেওয়া পলিথিন থেকে তিনি বানিয়েছেন জ্বালানি তেল! ছিপছিপে গড়নের তৌহিদুল ইসলামের বয়স মাত্র ২৫।জামালপুর কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন তৌহিদুল।নিজের উদ্ভাবনের পাশাপাশি টিউশনি করেন তিনি।পলিথিন থেকে উৎপাদিত তেল দিয়ে ২০১২ সাল থেকে নিজের মোটরসাইকেলটি তিনি চালান।তৌহিদুলের ভাষ্যমতে,১০০ কেজি পলিথিন থেকে ৭০ কেজি জ্বালানি তেল, ১০ কেজি মিথেন গ্যাস ও ২০ কেজি ছাপাকাজের কালি তৈরি করা যায়। এভাবে উৎপাদিত ১ কেজি জ্বালানি তেলের খরচ পড়ে মাত্র ১৭ টাকা। তার উদ্ভাবিত যন্ত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনও করতে পার। পলিথিন পুড়িয়ে প্রথম যে তেলটা আসে সেটা হয় কালচে রঙের। পরিশোধিত করার পর তা দেখতে হয়ে যায় হলুদ রঙের!ফেলে দেওয়া পলিথিন ব্যাগের কারণে তৌহিদুলের প্রিয় ফুলের বাগানের গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। তখন থেকেই পলিথিন নিয়ে ভাবনার শুরু। কীভাবে ওই উচ্ছিষ্ট পলিথিনগুলো নষ্ট করা যায় এটা ভাবতে শুরু করলেন।তারপর ভাবনা এলো, কীভাবে এসব পলিথিন কাজে লাগানো যায়।তখন তৌহিদুলের বয়স মাত্র ১০/১১ বছর। স্কুল ও কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়েছেন।বড় হয়ে তত্ত্বীয় জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক বিষয়ের সন্মিলন ঘটালেন।ক্লাসে রসায়ন নিয়ে পড়ার সময় তিনি দেখলাম যে পলিথিন এক ধরনের হাই টেমপারেট হাইড্রোকার্বন আর জ্বালানি তেল লো টেমপারেট হাইড্রোকার্বন।এখন একটি হলো হাইড্রোজেন ও কার্বনের চেইন, আরেকটি সরল একটি গঠন।কলেজে রসায়নের প্রভাষক একরামুজ্জামান ও তাঁর খালাতো ভাই মনিরুজ্জামান মনি বিভিন্ন সময় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।এই দুজনের সহযোগিতা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে যন্ত্রটি বানাতে।প্রথমে চেম্বারে পলিথিন দিতে হয়।এমন ভাবে তা করা হয় যাতে বাইরে থেকে অক্সিজেন ঢুকতে না পারে। যেন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা কার্বন মনো-অক্সাইড তৈরি করতে না পারে। এরপর ৩৫০ থেকে ৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়।৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে যখন উত্তপ্ত করা হয়, তখন পলিথিনের যে কার্বন ডাই-অক্সাইড চেইন আছে সেটা ভেঙে গিয়ে প্রচণ্ড চাপের বাষ্প হয়ে নল দিয়ে বের হয়। এরপর ঠাণ্ডা তরল হয়ে বোতলে জমা হয়। আর এখানে যে মিথেন গাস তৈরি হয় তা আবার এই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়।তরল জ্বালানি বের করে আনার পর সেখানে অনেক মুক্ত কার্বন তৈরি হয়, যা পড়ে ছাপার কাজে কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাণিজ্যিক ভাবে এই জ্বালানি তেল উৎপন্ন করার।কেবল অর্থ উপার্জন নয়।পলিথিন ধ্বংস করে পরিবেশ রক্ষা করাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে যদি কেউ এ কাজ করতে চায় তবে তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী মানবিক গুনসম্পন্ন মেধাবী তৌহিদুল।তার এই উদ্ভাবন আমাদের উজ্জীবিত করুক সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।