স্বদেশ বাংলা
Online news portal.

রাজনীতিবিদের কাছে রাজনীতি একটি পেশা

লেখক মোহাম্মদ হাসান স্বদেশ বাংলাঃ

126

রাজনীতিবিদের কাছে রাজনীতি একটি পেশা।রাজনীতি কি এবং কেন করতে হয়? আমাদের দেশের রাজনীতির যে ধারা চলছে, এ প্রেক্ষাপটে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। রাজনীতির সংজ্ঞা ব্যাপক এবং বিশ্লেষণ সাপেক্ষ ব্যাপার। এর যেমন পুস্তকীয় সঙ্গা রয়েছে, তেমনি অতি সরল সঙ্গাও রয়েছে। পুস্তকীয় ভাষায় রাজনীতির মূল কথা হচ্ছে, একটি রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, তার

সাংবিধানিক কাঠামো কী হবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে অনেক জটিল বিষয়-আসয় থাকে। সেগুলো সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। এগুলো গবেষণার বিষয়। এ জন্য রাষ্ট্র বিজ্ঞান নামে পড়ালেখার আলাদা বিষয় রয়েছে। তবে রাজনীতি বলতে সাধারণ মানুষ যা বোঝে তা হচ্ছে, এটি তাদের এবং সকলের কল্যাণের নীতি। তারা বোঝে, এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের কল্যাণে কাজ করে এবং সবসময়ই

করবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের মান-সম্মান এবং ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রেও রাজনীতি কাজ করবে। আমাদের দেশের রাজনীতি এবং এর ধারা কেমন তা সাধারণ মানুষ কম-বেশি জানে। স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা বোঝে, রাজনীতি তাদের কল্যাণে খুব কমই ব্যবহৃত হয়। এটা মূলত

তাদের জন্যই যারা দল গঠন করে এ নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে এবং থাকতে চায়। ক্ষমতায় যাওয়া এবং থাকার জন্য তারা এর নানারকম কলা কৌশল অবলম্বন করে। যদিও প্রত্যেকটি দলেরই লক্ষ্য রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করা, তবে এর প্রকৃত প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়।

প্রায় ১০০ বছর আগের কথা। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিক। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ম্যাক্স ওয়েবার কিছু শিক্ষার্থীর সামনে একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাঁর ওই বক্তব্যের নাম বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়—‘পেশা বা বৃত্তি হিসেবে রাজনীতি’। এতে রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতার স্বরূপ সম্পর্কে কিছু তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। এর ১০০

বছর পূর্তি হয়েছে গেলো বছর। সম্প্রতি এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যাক্স ওয়েবারের সেই তত্ত্ব আজকের দিনে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ, এখন রাজনৈতিক নেতারা যুক্তির পথে হাঁটার পরিবর্তে ভোটারদের মন জোগাতে অযৌক্তিক লোকরঞ্জনবাদী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এখন একক ক্ষমতাশালী হওয়ার প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের আগ্রহ বেশি। পাশ্চাত্যের তুলনায় এশিয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল।

রাজনীতি সম্পর্কে একটি বহুল চর্চিত বক্তব্য হচ্ছে, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।’ আর তাই মালয়েশিয়ায় অশীতিপর মাহাথির মোহাম্মদ চমক জাগিয়ে ফিরে আসেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। যে নাজিব রাজাক পরিবর্তনের ঢেউ তুলে নিজের হাতে সব ক্ষমতা নেওয়ার পাকা বন্দোবস্ত করে

ফেলেছিলেন, দুর্নীতির দায়ে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। চীনের রাষ্ট্রযন্ত্রের বৈধ ক্ষমতার কাছে অসহায় হতে হয় উইঘুরদের। আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পড়ে শ্রীলঙ্কায় পার্লামেন্ট হয়ে যায় মল্লযুদ্ধের মঞ্চ!‘একজন সত্যিকারের রাজনীতিবিদের কাছে রাজনীতি একটি পেশা’—শুধু এইটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি

ওয়েবার; নিখাদ রাজনীতিবিদের গুণাবলি নিয়েও আলোচনা করেছিলেন তিনি। এই গুণগুলো হলো প্যাশন বা গভীর আবেগ, দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা এবং অনুপাত-সম্পর্কিত জ্ঞান। রাজনৈতিক নেতার সামনে একটি ‘কারণ’ থাকে। তিনি শুধু ক্ষমতার জন্য বুভুক্ষু থাকবেন না। শুধু ক্ষমতার খিদে নেতাকে কোনো অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যায় না। অন্যদিকে,

একজন নেতার থাকতে হবে নৈতিক মেরুদণ্ড এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা। এর সঙ্গে যখন বিচার করার যোগ্যতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা যুক্ত হবে, তখনই একজন নেতা ইতিহাসের চাকার দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা অর্জন করবেন। মহৎ উদ্দেশে মন্দ উপায় অবলম্বনেও দ্বিধা হবে না তাঁর। নেতা হবেন বাস্তববাদী, প্রয়োজনে আপসও করবেন তিনি।

কিন্তু রাজনীতি কি আদতেই একটি পেশা? অন্তত এশিয়ার রাজনীতিবিদদের মধ্যে সেই মত জোরালো নয়। এখানকার রাজনীতিবিদেরা বলে থাকেন, স্রেফ জনগণের সেবা করতেই তাঁরা নাকি রাজনীতিতে পা রেখেছেন, অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই! কিন্তু আসলেই কি তা-ই? অন্তত বিভিন্ন সময়ে ওঠা দুর্নীতির এন্তার অভিযোগ তাতে সমর্থন জোগায় না।

বর্তমান বিশ্বে ম্যাক্স ওয়েবারের সংজ্ঞামাফিক ‘আংশিক নেতা’ অবশ্য ঢের পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন, তুরস্কে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, এদিকে মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ, ভারতে নরেন্দ্র মোদি—উদাহরণ টানলে এমন অনেক পাওয়া যাবে। এসব রাজনৈতিক নেতা ক্যারিশমার জোরে পুরো জনস্রোতকে নিজের দিকে টেনে নিতে

পারেন। তাঁরা ভোটে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন। পুরো রাজনৈতিক দলকে একা হাতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। রাজনীতিই তাঁদের জীবনের সবকিছু। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু যখনই নৈতিক মেরুদণ্ড, ক্ষমতার প্রতি নির্লোভ মনোভাব, বিচার করার যোগ্যতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতার প্রশ্ন উঠছে, তখন কিন্তু উল্টো চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। বৈষম্যহীনতা ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তাঁদের মুখে যতটা বুলি ফোটে, কাজে ততটা নয়।
আরো পড়ুন=>>> অজোপাড়া গায়ের দরিদ্র খাদিজা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক

এই বিভাগের আরও সংবাদ
Translate Language »